Saturday, March 2, 2019

‘সেনারা মাইনের বিনিময়ে কাজ করেন, তাহলে তাঁদের মৃত্যুর পরে কেন শহীদ বলা হবে বা মাতামাতি করা হবে’, এই প্রশ্নটা গত কয়দিনে অগুন্তি মানুষ করে ফেলেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু শিক্ষিত মানুষ, স্কুল টিচার, আইনজীবী, লেখক। তাঁদের মধ্যে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে, অনেকেরই বাড়ি ঘিরে পাড়ার লোকে হামলা চালিয়েছে। প্রথম প্রথম ভারী রাগ হচ্ছিল ওদের পোস্টগুলো পড়ে, তারপরে বুঝলাম ওদের মত একই কথা অনেকেই ভাবে, কিন্তু প্রশ্ন করার সাহস পাচ্ছেনা। যদি পুলিশ ধরে, যদি গনপিটুনি খায়। মারধোর করে বা উগ্রতা দেখিয়ে ওদের মুখ বন্ধ করা গেল, মানসিকতা পাল্টানো তো গেলনা। ওঁরা কিছু প্রশ্ন করেছিল, ধৈর্যের সাথে প্রশ্নগুলো পড়ে ভাবলাম উত্তর দেওয়া যাক। এই লেখাটা তাঁদের জন্য, যাদের মনে একই প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু পাবলিকলি জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছনা।

Holiday মুভিটায় একটা গল্প বলেছিল। একজন ভারতীয় জওয়ানকে শত্রুরা ধরে মারাত্মক অত্যাচার করে। বিয়ার বোতল পেছনে ঢুকিয়ে সেখানেই ভেঙে দেয়, চোখ উপড়ে নেয়। তার ছিন্নভিন্ন লাশটা দেখে মা কান্নাকাটি করছিল, বোন মাথা চাপড়াচ্ছিল। কিন্তু এক সপ্তাহ বাদেই তাঁর ভাই সেনাবাহিনীতে জয়েন করে নেয়। এটা শুধু গল্প নয়, বাস্তবতাও। যারা জওয়ান হয়, তাঁদের কাছে যৌবনেই বিকল্প থাকে পড়াশোনা করে আম-আদমির মত চাকরি বাকরি করার, তারপর স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে সংসার করার। তবুও ওঁরা বহু আগে থেকেই স্বপ্ন দেখে দেশের কাছে আত্মবলিদান দেবার। ক্যাপ্টেন আমেরিকার অরিজিনটা মনে আছে?

আর্মিতে ভর্তি হতে গেলে বহু ডেডিকেশন, হার্ডওয়ার্ক এবং স্বপ্ন দেখার প্রয়োজন হয় আর ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করতে হয় বহু আগে থেকেই। ধরো, তুমি এখন চাকরি পাচ্ছনা, টাকার বড্ড দরকার। যদি আর্মিতে গিয়ে বলো তোমায় ভর্তি নিতে, সেটা কোনোদিন সম্ভব হবে? তোমার ফিজিকাল ফিটনেসের ট্রেনিং, পড়াশোনা সবকিছুই শুরু করতে হবে বহু আগে থেকে। বরং গ্র্যাজুয়েট-মাস্টার্স-ইঞ্জিনিয়ার হতে গেলেও ততটা খাটনির প্রয়োজন হয়না যতটা আর্মির ট্রেনিং এ হয়।

ডাক্তার হওয়া বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যেমন স্বপ্ন, তেমনই দেশের হয়ে প্রাণ দেওয়াটাও মানুষের স্বপ্ন। এই স্বপ্ন দেখতে গেলে হিম্মত লাগে, বর্ডারে দাঁড়াতে বুকের পাটা লাগে। বছরের পর বছর নিজের পরিবারকে ছেড়ে থাকতে হবে জেনেও, পদে পদে মৃত্যুভয় আছে জেনেও যারা আমাদের রক্ষা করার স্বপ্ন দেখে তাদের মৃত্যুর তুলনা বাকীদের সাথে করা কি যায়? একজন ডাক্তারেরও হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় ‘অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ’ হতে পারে, কিন্তু তিনি মৃত্যু হবে জেনে ডাক্তারির পেশায় নিযুক্ত হননি, মানুষের সেবা করতে ডাক্তার হয়েছেন। তাই তাঁর মৃত্যুটা মৃত্যুই। কিন্তু একজন জওয়ান নিজের মৃত্যু হতে পারে জেনেও এই পেশায় নিযুক্ত হয়েছেন। বছরের পর বছর কসরত করে, পড়াশোনা করে আর্মিতে ভর্তি হবার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। তাই তাঁর মৃত্যু হলে তাঁকে “শহীদ” বলা হবে। যারা ভাবছ টাকার জন্য সেনারা আর্মিতে যোগ দেয়, তাঁরা ভেবে দেখো একজন জওয়ান টাকা নিয়েও কি নিজে ভোগ করতে পারে? সারাবছর বর্ডারের ধারে পাওয়া দূষিত জল, পোড়া রুটি, আলু সেদ্ধ খেয়ে দিন কাটান। মাইনের টাকায় সুইজারল্যান্ডে হানিমুনে যাননা, পাঁচ তারা রেস্তোরাঁয় ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করেন না। দিবারাত্র সব ত্যাগ করে আমাদের রক্ষা করা মানুষরা যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁকে “শহীদ” বলতে কিসের লজ্জা?

একজন জওয়ান, পলিটিক্স এমনকী দেশেরও উর্দ্ধে। জওয়ানরা বর্ডারে দাঁড়িয়ে আছে বলেই তুমি ফেসবুকে তাঁদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারছ। জওয়ানরা আমাদের প্রত্যক্ষ্য ভাবে রক্ষা করে, যেখানে মন্ত্রী, ডাক্তার, পুলিশ, এমনকী মুচি-মেথরও আমাদের রক্ষা করে পরোক্ষ ভাবে। আগেকার দিনে যুদ্ধ হলে রাজারা আগে থাকত, পেছনে থাকত সৈন্যরা। এখন যুদ্ধ হলে তোমাদের পছন্দের কোনো মন্ত্রী যুদ্ধে যাবেনা, রক্ত ঝড়বে জওয়ানদেরই। রক্ষা করার ক্ষেত্রে এই ডায়রেক্ট এবং ইনডায়রেক্ট পার্থক্যটাই শহীদ এবং মৃত্যুর মধ্যে পার্থক্য। ৪৪ জন শহীদের ছিন্নভিন্ন দেহ গেছে তাঁদের বাড়িতে। কারুর স্ত্রী হয়ত তাঁর স্বামীর কাটা হাতটুকুই ফেরৎ পেয়েছেন। শুনলাম একজন স্ত্রী কান্নাকাটি করছেন, “আমার স্বামীর মাথাটা ফেরৎ দাও”। অথচ সেদিন আমরা পার্কে প্রেমিকার সাথে ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করেছিলাম। তাঁদের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন যদি মাথায় আসে, তাহলে নিজেকে শিক্ষিত ভেবেই বা কি লাভ? কি দাম তোমাদের পড়াশোনা আর ডিগ্রির? বাকস্বাধীনতার অর্থ না বুঝে চ্যাঁচানো নয়।

দুঃখের বিষয় এগুলোও স্ট্যাটাস দিয়ে বোঝাতে হচ্ছে। এতগুলো শিক্ষিত মানুষ প্রশ্ন তুলছেন টাকার বিনিময়ে কাজ করা সেনাদের কেন শহীদ বলা হবে। তাদের বাড়ি ঘেরাও করে মারধোর করলেও কি মেন্টালিটি পাল্টাবে? যারা জিজ্ঞাসার খাতিরেই প্রশ্ন করছিল, তাঁদের যথাসাধ্য উত্তর দেবার চেষ্টা করলাম। আর যারা রাজনৈতিক কারণে জেনেবুঝে পাকিস্তান প্রেম দেখাচ্ছে, তাদের তৃতীয় চরণে প্রণাম। জওয়ানরা কোনোদিন তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পাননা। উপযুক্ত অর্থ তো নয়ই, বরং প্রাপ্য মর্যাদার আশাও রাখেন না। সিনেমার নায়কদের নাম সবাই মনে রাখে, নায়করা রাস্তায় বেড়োলে ভক্তেরা ঘিরে ধরে সেলফি তোলে। অথচ একজন রিয়্যাল লাইফ হিরো, একজন জওয়ান ভিড় বাসে বা মেট্রোয় উঠলে তাঁকে কেউ বসতেও দেয়না। অন্তত মৃত্যুর পরে তাঁদের “শহীদ” সম্মানটুকু দেওয়াটা ভারতবাসী হিসাবে কর্তব্য নয় কি?